তিলকপুর ইউনিয়ন, আক্কেলপুর

তিলকপুর,জয়পুরহাট । বিভাগ = রাজশাহী । বর্তমান চেয়ারম্যান = সেলিম মাহবুব সজল (selim mahbub) ।

[১]


তিলকপুর বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের একটি প্রাচীন মফস্বল, এটি সুতার তৈরী চাদর,কাপড় ক্রয়-বিক্রয়ের হাটের জন্য বিখ্যাত ছিল । সময়ের পরিক্রমায় সে হাট এখন হারিয়ে গেছে । তিলকপুরে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় একটি উচ্চ বিদ্যালয় এবং দুইটি কলেজ রয়েছে । তিলকপুরের প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হল তিলকপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় যা ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এটি একবার শ্রেষ্ঠ প্রাথমিক বিদ্যালয় হবার মর্যাদা লাভ করে উল্লেখ্য প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও একই বছর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল । তিলকপুর উচ্চ বিদ্যালয় ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সেই থেকে এটি এই অঞ্চলের মেধা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে । তিলকপুর বাজারের প্রানকেন্দ্র হলো তিলকপুর রেলওয়ে স্টেশন এটি বাংলাদেশের অন্যতম জাঁকজমকপূর্ণ রেলওয়ে স্টেশন তবে যাত্রীদের জন্য নয় মানুষ এবং দোকানপাঠের জন্য । প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত এই স্টেশন যেন এই এলাকার মানুষদের মিলনমেলা হয়ে ওঠে ।

ভৌগলিক উপাত্তসম্পাদনা

আয়তন: ৭১১২ একর, ২৮ বর্গ কিলোমিটার । এর উত্তরে জাফরপুর ও আক্কেলপুর দক্ষিণে বগুড়া জেলার ছাতিয়ানগ্রাম ও সান্তাহার পৌরসভা এবং পশ্চিমে নওগাঁ জেলার বিলাশবাড়ি গ্রাম অবস্থিত । তিলকপুর তিন জেলার মাঝখানে অবস্থিত মফস্বল ।

জনসংখ্যার উপাত্তসম্পাদনা

জনসংখ্যা ২৫৯২৫ জন । মোট ভোটার সংখ্যা ১৫৬৯২ জন (পুরুষ ৭৫০৫ জন মহিলা-৮১৮৭) । জনসংখ্যা ঘনত্ব পুরুষ ৪৫৪.৬৪ জন মহিলা-৪৭১.৫৫ জন মোট-৯২৫.৮৯ জন । |বড় পরিবার ১০৬০ টি । |মাঝারি পরিবার ২৫৫০ টি । |ক্ষুদ্র পরিবার ৯৫০ টি । |প্রান্তিক পরিবার ৭০৪ টি । |ভূমিহীন পরিবার ৯৩০ টি ।

ইতিহাসসম্পাদনা

কথিত রয়েছে এই এলাকায় তিলক নামে একজন রাজা ছিলেন যার নামানুসারে তিলকপুর নাম হয়েছে তবে তার সময়কাল জানা যায়নি । উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে এই এলাকায় জনবসতি গড়ে উঠতে শুরু করে বিশেষ করে ১৮৬২ সালে ব্রিটিশরা যখন রেলপথ চালু করে তখন থেকে এটি স্টেশন কেন্দ্রিক বাজার হয়ে উঠে যা বর্তমানে পূর্ব-পশ্চিম দুই ভাগে বিভক্ত ।

সংগঠন সমূহসম্পাদনা

হৈমন্তী সাংস্কৃতিক সংগঠন তিলকপুরের সাংস্কৃতিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে এটি তিলকপুরের প্রথম সাংস্কৃতিক সংগঠন । এই সংগঠনের উদ্যোগে বাঙ্গালী জাতির ঐতিহ্য পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে তিলকপুরে প্রথম বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়েছিল এবং তিলকপুরের প্রথম এবং একমাত্র পাবলিক লাইব্রেরিও এই সংগঠনের অবদান ।

জোহা স্মৃতি সংঘ তিলকপুরের অন্যতম সংগঠন যা খেলাধুলার ক্লাব হিসেবেও বিবেচিত । বিজয় দিবসে এই সংঘের পক্ষ থেকে বিভিন্ন খেলার আয়োজন করা হয় এবং পুরস্কার বিতরণ করা হয় ।

তিলকপুর স্পোর্টিং ক্লাব (টি.এস.সি) তিলকপুরের সর্বাধুনিক ক্লাব যা শুধু খেলাধুলার জন্য নয়, তিলকপুরের সার্বিক উন্নয়নেও ভূমিকা পালন করে চলেছে । বর্তমানে এই ক্লাবের আয়োজনে বৈশাখী মেলা উদযাপিত হয় ।

উল্লেখযোগ্য ব্যাক্তিসম্পাদনা

তিলকপুরে বেশ কিছু গুনীজন এবং প্রতিভাবান ব্যাক্তির জন্ম হয়েছে । আব্দুর রহমান(বাচ্চা হাজী) সাহেবের কথা প্রথমে আসে যিনি পায়ে হেটে মক্কা থেকে হজ করে এসেছিলেন । উনি ছিলেন মহৎ এবং ধর্ম পরায়ণ ব্যাক্তি ।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের প্রধান মেজর সাফিনুর রহমান এর জন্ম তিলকপুরের নওজোর গ্রামে , তিনি ১৯৮৪ সালে কমিশন্ড প্রাপ্ত অফিসার হিসেবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশে যোগদান করেন ।

রং নাম্বার খ্যাত চলচ্চিত্র অভিনেত্রী শ্রাবন্তীর জন্মও তিলকপুরে ।

তিলকপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কমলেন্দু সান্যাল তিলকপুরের একজন গুণীজন; তিনি বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তিনি একাধারে সঙ্গীতজ্ঞ, সমাজসেবক, সৃজনশীল এবং দক্ষ সংগঠক।


বিশিষ্ট সংগীত শিল্পী খালেদ মুন্না এই তিলকপুরেরই কৃতিসন্তান ।

তৃণমূলের বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আক্কেলপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জনাব মোকছেদ আলী মণ্ডল সাহেবের জন্মও এই তিলকপুরেই ।

ফসলসম্পাদনা

বাংলাদেশ কৃষিতে অন্যতম বলা চলে কৃষিনির্ভর দেশ, এদেশের মানুষের আয়ের সিংহভাগ কৃষি থেকে আসে তাই তিলকপুরের কৃষিও সমৃদ্ধ । ধান,পাট,আলু,খিরা,মূলা,টমেটো,করলা,সরিসা,বেগুন,পটল ইত্যাদি এই অঞ্চলে উৎপাদিত উল্লেখযোগ্য ফসল ।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসমূহসম্পাদনা

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাকে মসজিদের শহর বলা হয়, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার সিংহভাগই ইসলাম ধর্মের অনুসারী । তিলকপুরও এর ব্যতিক্রম নয় তাই স্বাভাবিক ভাবেই তিলকপুরে অসংখ্য মসজিদ এবং ওয়াক্তিয়া রয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য তিলকপুর স্টেশন জামে মসজিদ, তিলকপুর পূর্ব বাজার মসজিদ এবং তিলকপুর পশ্চিম বাজার মসজিদ ।

এছাড়াও তিলকপুরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্য তিনটি মন্দির রয়েছে, রাশকালী মন্দির এবং শ্যামাকালী মন্দির এই অঞ্চলের প্রাচীন মন্দির, সর্বশেষ ২০১০ সালে তিলকপুরে সার্বজনীন দূর্গা মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয় যার সম্পূর্ণ জমি তিলকপুরের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী স্বর্গীয় রামা প্রসাদ গুপ্ত দান করেন এবং নিজস্ব তত্বাবধানে তিলকপুরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্য মন্দির নির্মান করেন । ধর্মীয় অনুষ্ঠানের পাশাপাশি তিলকপুর দূর্গামন্দিরে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীনে মন্দির ভিত্তিক স্কুলের মাধ্যমে পাঠদান কার্যক্রম পরিচালিত হয় ।

হাস্যরসাত্মক তথ্য সমূহসম্পাদনা

তিলকপুরে বেশ কিছু পাগল রয়েছেন তাদের মধ্যে প্রথমেই আসে বেলাল পাগলার কথা যিনি এলাকার মানুষকে বহুদিন ধরে বিনোদন দিয়ে গেছেন।

মশুর পাগলা তিলকপুরের অন্যতম পাগলা হিসেবে পরিচিত যার কল্পনার জগতে স্বপ্না নামের এক নারী এখনো বিরাজ করে তবে আজ পর্যন্ত স্বপ্না চরিত্রটির রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হয় নি,ধারনা করা হয় স্বপ্না নামক এক নারীর জন্য মশুর তার মস্তিষ্কের স্বাভাবিকতা হারিয়ে ফেলেন এবং পাগল হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন, পৃথিবীতে সকল পাগলদের পাগল হবার পেছনে এক একটি ট্রাজেডি থাকে মশুরের সেই ট্রাজেডির নাম হয়ত স্বপ্না।

মশুরের পরেই আসে শিশু পাগলার কথা যিনি এলাকার সবার কাছে শিশু নামে পরিচিত, তার অন্যতম প্রধান গুন বিড়ি টানতে টানতে আপন মনে নিজের সঙ্গে কথপোকথন, তিনি মাঝেমাঝে গাঁজা সেবন করে আপন মনে হাটাহাটি করেন আর একা একা হেসে উঠেন। শিশুর পাগল হবার পেছনের ট্রাজেডি আজো উন্মোচিত হয় নি।

বকুল পাগলা তিলকপুরে জুনিয়র পাগলদের প্রথম সারির একজন, তাকে অনেকে মশুরের সহোদর মনে করে থাকেন তবে তিনি মশুরের সহোদর না হলেও মশুরের একমাত্র বন্ধু । বকুল বিখ্যাত তার লাইটার জ্বালানোর স্টাইলের জন্য, তিনি অসাধারণ কায়দায় লাইটার জ্বালিয়ে বিড়ি ধরান ।

এছাড়াও তিলকপুরে বেশ কয়েকজন পাগল রয়েছেন, তিলকপুরের অদূরে নূরনগর নামক গ্রামকে অনেকেই পাগলা পাড়া বলে অভিহিত করে থাকেন।

এই চরিত্র এবং তথ্য গুলো হয়তো হাস্যরসাত্মতক, আমরা এসব চরিত্র থেকে মজা পাই, আনন্দ আহরন করি আবার অনেকে তাচ্ছিল্যও করে থাকি তবে কেউ এই চরিত্রগুলোর হাস্যরসের পেছনের কাহিনী জানি না, ওরাও তো মানুষ ওরাও তো স্বাভাবিক ছিলো তাহলে কে ওদেরকে এমন হতে বাধ্য করলো? উত্তরে হয়তো সমাজ,ব্যাক্তি,নারী,প্রেম,অবহেলা এসবই আসবে, আমাদের মতোই কোন স্বাভাবিক মানুষের অস্বাভাবিক আচরন ওদেরকে এমন করে তুলেছে না হয় পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম রুপ প্রত্যক্ষ করতে করতে ওরা এমন হয়ে গেছে। সে যাই হোক ওদের প্রধান পরিচয় মানুষ ওরা সৃষ্টির সেরা জীব তাই আসুন ওদেরকে নিয়ে হাসি ঠাট্টা না করে সুন্দর ব্যবহার করি, সম্মান করতে না পারলেও অন্তত অসম্মান যেন না করি, সুন্দর ব্যবহার এবং ভালো আচরণ একটা মানুষের মাঝে সামাজিক মূল্যবোধ তৈরী করে।